ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেল নগদ ও কড়ি

150
ডিজিটাল ব্যাংক

নিউজ ডেস্ক : দেশে প্রথম ডিজিটাল ব্যাংক গঠনের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রবিবার (২২ অক্টোবর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বোর্ডসভায় আট প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যাংক গঠনের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ডিজিটাল ব্যাংকিং গঠনের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি এবং এসিআইয়ের কড়ি ডিজিটাল পিএলসি।

 

এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংকিং গঠনের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ব্যাংক দুটি হচ্ছে নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি এবং এসিআইয়ের কড়ি ডিজিটাল পিএলসি। এ ছাড়া তিন প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল উইং চালুর অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি তিন প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমতি পাবে। তবে এখন অনুমতি পাওয়া দুই প্রতিষ্ঠানের সেবা কেমন, তা পর্যালোচনার পর।

 

কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি একটি এসিআই এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। এসিআই তাদের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো ই কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি -কে সুন্দরভাবে সাজাবেন বলে তাদের আশাবাদ।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ৯ প্রতিষ্ঠানের নাম পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করা হয়। একটির সঙ্গে বীমা কম্পানি যুক্ত থাকায় আটটিকে বিবেচনা করেছে পরিচালনা পর্ষদ।

 

মেজবাউল হক জানান, নগদ ডিজিটাল ব্যাংক ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ১০ ব্যাংকের উদ্যোগে গঠিত ডিজিটেন ডিজিটাল ব্যাংকিং, বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকিং ও ব্যাংক এশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংককে ডিজিটাল উইং চালুর অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

 

এ ছাড়া দুই পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংকিং চালুর ছয় মাস পর সেবা পর্যালোচনা করে আরো তিন ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এগুলো হলো স্মার্ট ডিজিটাল ব্যাংকিং, নর্থ ইস্ট ডিজিটাল ব্যাংকিং ও জাপান-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক।

 

জানতে চাইলে নগদ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক বলেন, ‘নগদ ডিজিটাল ব্যাংকিং হবে বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নপূরণের ব্যাংক, যা জীবনের প্রতিটি আর্থিক পদক্ষেপকে ডিজিটালি প্রভাবিত করবে। কোটি কোটি ব্যাংকবহির্ভূত মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে আর্থিক লেনদেনে যে সুপারসনিক গতি প্রয়োজন তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আবর্তিত হবে সেবা কার্যক্রম। ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ ও সঞ্চয়সেবা আর্থিক কাঠামোকে শক্তিশালী করবে।

 

নতুন লাইসেন্স পাওয়া ব্যাংক দুটি ছাড়াও আরো তিনটি আবেদনকারীর প্রত্যেককে বিভিন্ন প্রথাগত ব্যাংকের সহায়তায় ডিজিটাল ব্যাংকিং প্ল্যাটফরম প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ছয় মাস মেয়াদে প্রথম দুটি ডিজিটাল ব্যাংকের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে। এই মেয়াদের পর তিনটি ফিনটেক প্রতিষ্ঠানও লাইসেন্স পেতে পারে।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাথমিকভাবে শুধু দুই বা তিনটি ব্যাংককে অনুমতি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লাইসেন্সের জন্য মোট ৫২টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে।

 

ডিজিটাল ব্যাংক যেভাবে পরিচালিত হবে
  • আইন অনুসারে ডিজিটাল ব্যাংককে বাংলাদেশে একটি নিবন্ধিত প্রধান কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কার্যালয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রকসহ স্টেকহোল্ডারদের যোগাযোগের মূল পয়েন্ট হবে।
  • গাইডলাইন অনুসারে, নিবন্ধিত প্রধান কার্যালয়ে ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের অফিস থাকবে। এটি ফিজিক্যাল ও ডিজিটাল দুভাবেই গ্রাহকের অভিযোগ গ্রহণ এবং সমাধানের জন্য কেন্দ্রীয় হাব হিসাবে কাজ করবে। তবে ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো ফিজিক্যাল শাখা/উপশাখা বা উইন্ডো অনুমোদন পাবে না।
  • গ্রাহককে জানিয়ে বা না জানিয়ে দৈনিক লেনদেন সামলানোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত একটি প্রযুক্তিভিত্তিক বিরোধ নিষ্পত্তি মেকানিজম থাকবে।
  • ডিজিটাল ব্যাংক সময় সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবিধান মেনে প্রচলিত ব্যাংক বা এমএফএস প্রদানকারীদের এজেন্টদের ব্যবহার করতে পারবে। তবে ডিজিটাল ব্যাংকের নিজস্ব কোনো এজেন্ট থাকবে না।
  • ডিজিটাল ব্যাংক অনলাইন এন্ড-টু-এন্ড প্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে দক্ষ, সাশ্রয়ী ও উদ্ভাবনী ডিজিটাল আর্থিক পণ্য ও পরিষেবা সরবরাহ করবে। এটি গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে এবং সেবাবঞ্চিত, কম সেবা পাওয়া ও প্রত্যন্ত এলাকার (পার্বত্য জেলা, দ্বীপ ইত্যাদি) মার্কেট সেগমেন্টকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনতে এআই, মেশিন লার্নিং, ব্লকচেইন ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে।
  • ডিজিটাল ব্যাংকগুলো কোনো ওভার-দ্য-কাউন্টার (ওটিসি) সেবা দেবে না। এদের নিজস্ব কোনো শাখা বা উপশাখা, এটিএম/সিডিএম/সিআরএমও থাকবে না।
  • গ্রাহকদের লেনদেনের সুবিধার্থে ডিজিটাল ব্যাংক ভার্চুয়াল কার্ড, কিউআর কোড ও অন্য কোনো উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য দিতে পারে। কিন্তু লেনদেনের জন্য কোনো ফিজিক্যাল উপকরণ দেওয়ার অনুমতি নেই এ ব্যাংকের।
  • ডিজিটাল ব্যাংকগুলো প্রবাসী কর্মীদের রেমিট্যান্স সংগ্রহ করা ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন বা বাণিজ্য অর্থায়নে যুক্ত হতে পারবে না।
  • ডিজিটাল ব্যাংকগুলোকে কোম্পানি আইন অনুযায়ী সময়ে সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ন্যূনতম নগদ জমা (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) বজায় রাখতে হবে।
  • ডিজিটাল ব্যাংককে সময়ে সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও-ও (এডিআর) বজায় রাখতে হবে।
  • ব্যাসেল থ্রি আরবিসিএ গাইডলাইন অনুসারে বা এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া গাইডলাইন অনুযায়ী ডিজিটাল ব্যাংককে সবসময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) ও লিকুইডিটি রেশিও (এলসিআর—লিকুইডিটি কাভারেজ রেশিও ও এনএসএফআর—নিট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও) বজায় রাখতে হবে।
  • ডিজিটাল ব্যাংকগুলো ব্যাংক আমানত বীমা আইন, ২০০০-এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স স্কিম মেনে চলবে।

এছাড়া ডিজিটাল ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর নীতি অনুসারে অথবা এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া নির্দেশনা অনুসারে সময় সময় করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যকলাপও পরিচালনা করতে হবে।

স্পনসরদের যা লাগবে
  • ৫ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারধারী একটি স্পনসরকে যৌথভাবে ক্যাপিটাল মেইনটেন্যান্স চুক্তি (সিএমএ) স্বাক্ষর করতে হবে এবং ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে কমে গেলে নানাভাবে বাড়তি মূলধন জোগান দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ ধরনের মূলধন জোগান দিতে না পারলে প্রয়োজনীয় মূলধন জোগানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্পনসর গ্রুপের ব্যক্তিদের ওপর বর্তাবে।
  • গত পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো সময়ে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ খেলাপি হয়েছেন বা ছিলেন, এমন কোনো ব্যক্তি বা তার পরিবারের কোনো সদস্য প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকের স্পনসর হিসেবে আবেদন করার যোগ্য হবেন না।
  • ঋণ খেলাপি অবস্থার বিরুদ্ধে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে কোনো নিষ্পত্তিকৃত মামলার রায়ের অপেক্ষায় আছেন, এমন কোনো ব্যক্তিও ডিজিটাল ব্যাংকের স্পনসর হিসেবে আবেদন করতে পারবেন না।
  • বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবসা শুরু হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে স্পন্সর শেয়ার হস্তান্তর করা হবে না। ব্যবসা শুরুর তারিখ থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যাংক পাবলিক শেয়ার ইস্যু করবে।
  • স্পনসর/পরিচালকদের অবশ্যই ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্ট (এফপিটি) মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তাবিত পৃষ্ঠপোষকদের দক্ষতা ও সততা এবং যেকোনো সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি যাচাই করবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক এফপিটির অংশ হিসেবে যেসব ব্যবসায় স্পনসরদের নিয়ন্ত্রণ বা যথেষ্ট মালিকানা রয়েছে, বিশেষ করে আর্থিক সেবা প্রদানকারী ব্যবসার আর্থিক পারফরম্যান্স বিবেচনা করতে পারে।
  • কোনো ব্যাংকিং কোম্পানির পরিচালক বা উপদেষ্টা বা পরামর্শদাতা প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না।
  • এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ কতজন পরিচালক হতে পারবেন, তা ঠিক করা হবে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী।
  • ডিজিটাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ৫০ শতাংশ সদস্যের প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং, উদীয়মান প্রযুক্তি, সাইবার আইন-কানুনের বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা, জ্ঞান ও দক্ষতা থাকতে হবে। আর বাকি ৫০ শতাংশ সদস্য ব্যাংকিং, ই-কমার্স, এবং ব্যাংকিং আইন ও প্রবিধান ইত্যাদি নিয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা রাখবেন।
  • বোর্ডে দ্বৈত নাগরিকসহ প্রবাসী ব্যক্তি বা কোম্পানির মোট ভোটের হিস্যা ৫০ শতাংশে বেশি হতে পারবে না।
ব্যবস্থাপক পদের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত
  • ডিজিটাল ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) ব্যাংকিং পেশায় কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা; যার মধ্যে প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং, রেগুলেশন, গাইডলাইন, সার্কুলার ইত্যাদি ক্ষেত্রে কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
  • ডিজিটাল ব্যাংকের সিইওর নিয়োগ এ বিষয়ে নানা সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা বিভিন্ন রেগুলেশন ও নির্দেশনা অনুযায়ী হবে।
  • প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও), প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিআইটিও), প্রধান তথ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা (সিআইএসও), প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (সিআরও), ইন্টার্নাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স প্রধানের (এইচআইসিসি) প্রযু্ক্তিভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
  • ডিজিটাল ব্যাংকের সিওও, সিএফও, সিআইটিও, সিআইএসও, সিআরও, এইচআইসিসি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারিকৃত নিয়মকানুন ও নির্দেশনা মেনে চলবেন।
আবেদন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া
  • একটি প্যানেলের সদস্যবৃন্দ শর্টলিস্টে জায়গা পাওয়া আবেদনগুলো মূল্যায়ন করবেন। এ প্যানেল সদস্যদের মনোনয়ন দেবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।
  • এরপর নির্বাচিত আবেদনকারীরা ডিজিটাল ব্যাংকিং স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি লেটার অভ ইনটেন্ট (এলওআই) পাবে।
  • প্রস্তাবিত ব্যাংক যদি শর্তসমূহ পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর এলওআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।

 

Related Post:
এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নগদের লাইসেন্স পেল নগদ ফাইন্যান্স